Ads Area


আকবরের ধর্মনীতির বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন করো - দীন-ই-ইলাহি কি নতুন ধর্মমত ছিল

আকবরের ধর্মনীতির বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন করো - দীন-ই-ইলাহি কি নতুন ধর্মমত ছিল


আকবরের ধর্মনীতির বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন করো - দীন-ই-ইলাহি কি নতুন ধর্মমত ছিল



আকবরের ধর্মনীতির বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ন করো। দীন-ই-ইলাহি কি নতুন ধর্মমত ছিল? (Estimate the significance of the religious policy of Akbar. Was Din-I-Ilahi a new religion?)




উত্তর-

ভারতের মুসলমান সম্রাটদের মধ্যে সম্রাট আকবর সর্বাধিক উদার ধর্মনীতিজ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। একজন সুন্নি মুসলমান হিসেবে জীবন শুরু করে নানা অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এক ‘সমন্বয়ী ধর্মবিশ্বাসে’ ব্রতী হয়েছিলেন। তবে এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।

আকবর আন্তরিকভাবেই বিভিন্ন ধর্মের স্বরূপ উদ্ঘাটনে উদ্গ্রীব থাকতেন। আকবরের এই ধর্মীয় অনুসন্ধিৎসার কথা তাঁর গোঁড়া সমালোচক বদায়ুনীও স্বীকার করেছেন। বদায়ুনী লিখেছেন যে, “আকবর ঊষাকালে প্রাসাদের নির্জন স্থানে নতমস্তকে ভাবাবিষ্ট হয়ে উপবেশন করে স্বর্গীয় আশীর্বাদ প্রার্থন করতেন” ("Akbar would sit many a morning alone in prayers and malancholy.... near the palace in a lonely spot with his head bent over his chest and gathering the bless of early hours.”)।

বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের স্বরূপ উদ্ঘাটনের এই অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাঁর ধর্মচিন্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছিল। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক ও দার্শনিক প্রভাব, -যা তাঁকে গোঁড়ামিবর্জিত, উদার ও সর্বজনীন ধর্মবিশ্বাসে আকৃষ্ট করেছিল।


(1) পারিবারিক প্রভাব:

আকবর জন্মেছিলেন একটি সংস্কৃতিবান ও সংকীর্ণতামুক্ত পরিবারে। তাঁর পূর্বসূরিদের অনেকেই সুফিদের উদারতার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পিতা হুমায়ুন ও মাতা হামিদাবানু -উভয়েই ছিলেন উদারতা ও সহিষ্ণুতার পূজারি। স্বাভাবিক ভাবেই এই পারিবারিক নৈতিকতা আকবরের চরিত্রে বর্তেছিল।

(2) দার্শনিক প্রভাব:

আবুল ফজল, শেখ মুবারক, আব্দুল লতিফ, ফৈজী প্রমুখ উদার মানসিকতা সম্পন্ন পণ্ডিতদের সাহচর্য আকবরের জ্ঞানপিপাসাকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং তাঁকে সুফিবাদের উদার দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তিনি প্রতিনিয়ত এঁদের পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। এঁদের যুক্তিবাদী ঈশ্বরভাবনা আকবরের উদার ধর্মচিন্তার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল।

(3) রাজপুত বেগমদের প্রভাব:

নিজের রাজপুত মহিষীদের ধর্মচর্চা, আচার ব্যবহার এবং হিন্দু ধর্মাচার্যদের সংস্কার আন্দোলন আকবরের ধর্মমত গঠনে সাহায্য করেছিল। এইভাবে একাধিক প্রভাব আকবরের ধর্মবিশ্বাসের পটভূমি রচনা করেছিল।

ধর্মজীবনের তিন পর্যায়:

আকবরের ধর্মজীবনকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায় ছিল ১৫৬০ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়ে তিনি ছিলেন ইসলামের সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী। ১৫৭৫ থেকে ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে তাঁর ধর্মজীবনের দ্বিতীয় পর্যায় বলা যেতে পারে। 

এই সময়ে তিনি ক্রমশ ইসলামের প্রতি বিশ্বাস হারাতে থাকেন। এই সময় শেখ মুবারক ও তাঁর পুত্র আবুল ফজলের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য এবং তাঁদের সুফিবাদের কথা সম্রাটকে নতুন পথের সন্ধান দেয়। অবশ্য তাঁর ধর্মভাবনার পরিবর্তন শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে, অর্থাৎ যখন তিনি ফতেপুর সিক্রিতে ইবাদখানা নামক নতুন উপাসনাগৃহের উদ্বোধন করেন।

প্রথমে তিনি এখানে কেবল ইসলামশাস্ত্রে পণ্ডিতদেরই আহ্বান জানান। কিন্তু ইসলামি পণ্ডিতরা ইসলামের অন্তর্নিহিত দর্শন আলোচনার পরিবর্তে ইসলামের গোঁড়ামি জাহির করতে এবং অন্যান্য ধর্মকে আক্রমণ করতে শুরু করলে আকবর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। তখন তিনি হিন্দু, খ্রিস্টান, জৈন, জরথুষ্ট্র প্রভৃতি অন্যান্য ধর্মবিশারদের ধর্মালোচনার জন্য আহ্বান জানান।

এখানে যোগদানকারী পণ্ডিতদের মধ্যে পুরুষোত্তম, দেবী, হরিবিজয়, বিজয় সেন সুরী, ফাদার একোয়াভাইভা, ফাদার অ্যান্টনী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

মাহজার ঘোষণা:

এই সময়ে ধর্মান্ধ উলেমাগণ আকবরকে ‘ধর্মদ্রোহী’ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু নির্ভীক আকবর হিন্দুবিরোধী কার্যকলাপের অপরাধে ধর্মপ্রধান আব্দুল নবিকে বরখাস্ত করতেও দ্বিধা করেননি। ফলে উলেমা ও গোঁড়াপন্থীদের প্ররোচনায় কোনো কোনো স্থানে আকবরের বিরুদ্ধে ধর্মবিদ্রোহের ডাক দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় আকবর এক ‘মাহজার’ বা ঘোষণা জারি করে নিজের হাতে কোরানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকারীর ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

ভি. স্মিথ এই ঘোষণাকে ‘অভ্রান্ত কর্তৃত্বের ঘোষণা’ (Infamibility Decree) বলে অভিহিত করেছেন।


‘দীন-ই-ইলাহি’ ঘোষণা:


১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ থেকে তাঁর ধর্মজীবনের তৃতীয় বা শেষ পর্যায় শুরু হয়। ইবাদখানার আলোচনা থেকে তিনি বুঝেছিলেন যে, সব ধর্মেই ঈশ্বরের মহিমা প্রচার করা হয়েছে। তত্ত্বগত পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেক ধর্মে কতকগুলি মৌলিক সত্য বিরাজ করেছে। তাঁর মনে হয়, বিভিন্ন ধর্মের কল্যাণকর দিকগুলির সমন্বয় সাধন করতে পারলে মানবসমাজ উপকৃত হবে। এর পর ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর বিখ্যাত তৌহিদ ইলাহি বা দীন-ই-ইলাহি মতবাদ ঘোষণা করেন।

মতাদর্শ - আকবর - প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’ শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের আদেশ’। এই মতবাদে কোনো দেবদেবীর স্থান ছিল না। সম্পূর্ণভাবে যুক্তিনির্ভর এই মতবাদে জাগতিক বিষয় সম্পর্কে উদারতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার উপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে।

ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে, দিন-ই-ইলাহি ছিল সকল ধর্মমতের সারযুক্ত সর্বেশ্বরবাদী ধারণ, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল অতিন্দ্রীয়বাদ, দর্শন ও প্রকৃতিপূজা। এর নিজস্ব কোনো তত্ত্ব, দেবদেবী বা প্রচারক ছিল না।

সম্রাটই ছিলেন এই ব্যবহারিক দর্শনের একমাত্র প্রচারক (Din-I-Ilahi was an eclectic pantheism containing the good of all religions - a combination of mysticism, philosophy and nature worship .... it upheld no dogma, recognised no gods or prophet and emperor was its chief exponent.)।

এই মতবাদে ধর্মানুসরণের জন্য চারটি মার্গের কথা বলা হয়েছে, যথা- সম্পত্তি ত্যাগ, অহং ত্যাগ, মাশ্চর্য ত্যাগ এবং গোঁড়ামি ত্যাগ। দীন-ই-ইলাহিদের পালনীয় কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে - গোমাংস তথা আমিষ ভক্ষণ থেকে বিরত থাকা, জন্মমাসে দান করা, দীন-দরিদ্র-আতুরকে সাধ্যানুযায়ী সেবা করা ইত্যাদি। ‘দীন-ই-ইলাহি’ গ্রহণে সম্রাটের অনুমতি ছিল বাধ্যতামূলক।

যে- কোনো রবিবার এই ধর্মগ্রহণেচ্ছু ব্যক্তি নতজানু হয়ে সম্রাটের পায়ে মাথা রেখে ‘আল্লাহো আকবর’ অর্থাৎ ঈশ্বর মহান এই শব্দটি উচ্চারণ করবেন। তারপর সম্রাট সেই ব্যক্তির মাথায় হাত রেখে তাকে দাঁড় করিয়ে দেবেন। অতঃপর ওই ব্যক্তি ‘ইলাহি’ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।

নতুন ধর্ম কিনা?

আকবর- প্রবর্তিত ‘দীন-ই-ইলাহি’ কোনো নতুন ধর্মমত ছিল। কিনা- এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। ঐতিহাসিক বদায়ুনী ‘দীন-ই-ইলাহি’ কে ইসলাম বিরোধী ও সম্পূর্ণ নতুন একটি ধর্মমত বলে অভিহিত করেছেন। জেসুইট পাদরিগণও এই মত সমর্থন করে বলেছেন যে, ইসলামিদের এই নতুন ধর্মমত গ্রহণের জন্য আকবর অত্যাচারও করতেন। অধুনা ব্লকম্যান বা স্মিথও উপরিলিখিত মত সমর্থন করেছেন।

ভিনসেন্ট স্মিথ (V. A. Smith) আকবরের সমালোচনা করে লিখেছেন যে, ‘দিন-ই-ইলাহি’ আকবরের প্রজ্ঞা নয়, পাহাড়প্রমাণ ভ্রান্তির নিদর্শন। সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি ছিল সম্রাটের অহংসর্বস্বতা ও সীমাহীন স্বৈরাচারিতার প্রকাশ” (The Divine faith Din-I-Ilahi was a monument of Akbar's folly; not of his wisdom. The whole scheme was the outcome of rediculous vanity, monstrous growth of unrestrained autocracy.)।

কিন্তু ‘দীন-ই-ইলাহি’র স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে উপরিলিখিত মতবাদের সমর্থন মেলে না। বদায়ুনী বা জেসুইট পাদরিদের বক্তব্য ছিল পক্ষপাতদোষে দুষ্ট। তাঁদের গোঁড়া ধর্মবিশ্বাস আকবরের যুক্তিবাদকে সহ্য করতে পারেনি। আকবর যে অত্যাচার দ্বারা নতুন ধর্মগ্রহণে বাধ্য করেননি, তার বড়ো প্রমাণ হল ইলাহি সমর্থকদের সংখ্যাল্পতা।

সম্রাটের নিকট ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র বীরবল ছাড়া সবাই ছিলেন ইসলাম। ভগবান দাস, টোডরমল, মানসিংহ প্রমুখ উচ্চ পদাধিকারীগণ স্ব স্ব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। অনেকের মতে, ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথের মতো আকবরের ধর্মনীতি গঠনের পেছনেও রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল।

অনেকের মতে, এ বক্তব্য ঠিক নয়। কারণ আকবর যে বিরাট রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, তাতে ধর্মীয় শক্তির প্রয়োজন ছিল না। আসলে সর্বধর্ম সমন্বয়ের উদ্দেশ্যেই তিনি এই কাজে ব্রতী হয়েছিলেন।


আকবর ইসলামবিরোধী কিনা?


আকবর কোনোভাবেই ইসলামবিরোধী ছিলেন না বা তাঁর ‘দীন-ই-ইলাহি’ কোনো নতুন ধর্মমত ছিল না। আবুল ফজলের মতে, “আকবর জন্মে যেমন একজন মুসলমান ছিলেন, মৃত্যুকালেও তেমনি একজন মুসলমানই ছিলেন।” তাঁর ধর্মভাবনার মূল কথাই ছিল ‘সূলহ-ই-কুল’ বা পরধর্ম সহিষ্ণুতা।

ভন নোর (Von Noer) -এর ভাষায়: ধর্ম বিষয়ে আকবরের এই ধারণা তাঁকে সর্বকালের জন্য মানবতাবাদী, মহান ও সর্বজনীন সহিষ্ণু-নীতির প্রচারক হিসেবে স্মরণীয় করে রাখবে (One of his creation will assure to him for all time a prominent place among the benefactors of humanity, greatness and universal toleration in matters of religious belief.)।

এস. নোমানীর মতে, “আকবর কখনোই ইসলামবিরোধী ছিলেন না।”

ত্রিপাঠীর মতে, “দেশবিদেশের বহু নৃপতির মতো আকবরও প্রজাদের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বদানে উদ্যোগী হয়েছিলেন এবং এ কাজে কেবল তাদেরই গ্রহণ করেছিলেন, যারা স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে সম্রাটের ধর্মীয় নেতৃত্বকে আহ্বান করেছিলেন।”

যাই হোক, ‘দীন-ই-ইলাহি’ দীর্ঘজীবী বা বহুল প্রসারিত হয়নি। তবুও ভারত ইতিহাসে এর গুরুত্ব অনেক।

ড. ঈশ্বরীপ্রসাদের মতে, “তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল নানা জাতি নানা ধর্মের দেশ ভারতবর্ষের সংহতি, যা তিনি দীন-ই-ইলাহি মতাদর্শের মধ্যে দিয়ে পেঁতে চেয়েছিলেন” (His real object was to unite the people of his empire into an organic whole by supplying a common bond. This he hoped to accomplish by founding the Din-I-Ilahi or the Divine faith.)।

মধ্যযুগীয় সীমাবদ্ধতা ও গোঁড়ামির মাঝে আকবর যে ধর্মীয় উদারতা ও সমন্বয়ী মনোভাব দেখিয়েছিলেন, তা যদি পরবর্তী সম্রাটেরা অনুসরণ করতেন, তাহলে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হত।

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Ads Area